আকাশের রঙ আজ অনেকটা পুরনো পাণ্ডুলিপির মতো—বিবর্ণ, অথচ এক অলৌকিক সুবাসে মাখানো। আমি এই কুঁড়েঘরে বসে আছি কতকাল, তার কোনো হিসাব ফেরেশতাদের খাতার বাইরে কোথাও নেই। অথচ, এই ঘরটি আমার নয়। দেয়ালের প্রতিটি কণা, ছাদের প্রতিটি খড়, আর মেঝের শীতল মাটি—সবই যেন এক অদ্ভুত একাত্মতার অভাবের ভাষায় কথা বলে। তারা আমাকে চেনে, কিন্তু স্বীকার করে না।
আমি এক ভাড়াটে
বসতি। এক ছদ্মবেশী মালিক।
পরের
জায়গা, পরের জমিন।
সেজদাহ্ দিতে
যখন কপাল মাটিতে ঠেকাই, তখন মাটির নিচ থেকে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস
ভেসে আসে। সেই দীর্ঘশ্বাসে আরশের কোনো এক নাম না জানা নূরের ঝিলিক থাকে। আমার মনে
হয়, আমার এই দেহটা আসলে একটা ধার করা ‘জুব্বা’। ভেতরে যে
সত্তাটি বসে আছে, সে এক ছটফটে পাখি। খাঁচাটা মাটির, কিন্তু পাখির ডানায় লেগে আছে সিদরাতুল মুনতাহার ধুলো। আমি ঘর বানাই,
দেয়াল তুলি, মায়ার চুনকাম করি—অথচ দিনশেষে
বুঝতে পারি, এই অট্টালিকা আসলে এক গোধূলির মরীচিকা।
জবরদখল
ও মহাজনের নীরবতা
এই যে বিশাল
জমিদারি,
এই যে শিরা-উপশিরায় বয়ে চলা রক্তিম নহর—এর হুকুমদারি আমার হাতে নেই।
আমি হাত নাড়াতে চাই, কিন্তু সেই ইচ্ছার সুতো বাঁধা আছে অন্য
এক অদৃশ্য আঙুলে। যিনি এই দেহের মালিক, যিনি এই রুহের
‘জমিদার’, আমি তো তাঁর দেখা পাই না। তিনি কি কুদরত্-এর
পর্দার আড়ালে মুচকি হাসছেন? নাকি আমার এই অবাধ্যতায় তিনি
ব্যথিত?
মাঝে মাঝে
মধ্যরাতে যখন জিকিরের শব্দে আমার হৃদপিণ্ড কেঁপে ওঠে, তখন মনে হয়—আমি তো এক ভিখারি। নিজের ঘরেই আমি পরবাসী। সেই জমিদারের
মহব্বতে এক ফোঁটা অশ্রু যখন চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে, সেটি তখন আর
নোনা জল থাকে না। মরমী কবিরা বলেন, ওটা নাকি বেহেশতের কোনো
ঝরনার চ্যুত অংশ। কিন্তু আমার দুঃখ কাটবে কার কাছে? মনের এই
গহীন বেদনার কথা কাকে বলি? এই মাটির পৃথিবী তো ভাষা বোঝে না,
সে শুধু জানে গ্রাস করতে।
আমি হাহাকার
করি। আমার নাফস (অহং) আমাকে বলে, “সবই তো তোর!” কিন্তু আমার কলব
(হৃদয়) কাঁদে। সে জানে, এই বাগান, এই
শস্যশ্যামল দেহ-জমিন—সবই এক অস্থায়ী সরাইখানা।
চাষহীন
জমি ও বারো মাসের হাহাকার
জমিদার চেয়েছেন
আমি যেন তাঁর সন্তুষ্টির বীজ বুনি। তিনি চেয়েছেন এখানে ‘সবর’ (ধৈর্য) আর ‘শুকর’
(কৃতজ্ঞতা)-এর ফসল ফলুক। কিন্তু আমি? আমি তো আমার খেয়ালখুশির
চাষ করেছি। আমার অবাধ্যতার রোদে পুড়ে জমি ফেটে চৌচির। আহা! যে জমিতে মা’রিফাতের
ফুল ফোটার কথা ছিল, সেখানে আজ কামনার আগাছা।
তাই তো
ফসল ফলে না রে, দুঃখ বারো মাস।
যখনই আমি নিজের
‘আমি’ত্বকে বড় করে দেখি, তখনই আসমানি বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়। আমার
রুহ তখন এক তৃষ্ণার্ত মরুভূমি। মাওলানা রুমি যেমন বলেছিলেন, বাঁশি
যখন তার মূল বাঁশঝাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তার সুরে কেবল
বিচ্ছেদের সুরই বাজে। আমার অবস্থাও তাই। আমি আমার মূল মালিকের থেকে বিচ্ছিন্ন এক
ভাঙা বাঁশি। সুর বের হয় ঠিকই, কিন্তু তাতে শুধু কান্নার নোনা
স্বাদ।
খাজনা ও
নীলামের খেলা
আমি প্রতিদিন
পাঁচবার খাজনা দিই। কপালে কালো দাগ ফেলি। মুখে তসবির দানা ঘুরি। ভাবি, এই তো আমি সব খাজনা চুকিয়ে দিলাম! এবার বুঝি এই জমি আমার হলো!
কিন্তু না।
অহংকার নামের এক দস্যু এসে রাতের অন্ধকারে আমার সব পুণ্য লুটে নেয়। আমি ভাবি আমি
অনেক বড় আবিদ (উপাসক), অথচ আমার ইখলাস (নিষ্ঠা) নেই। ফলে,
আমার আমলনামার ‘দাখিলা’ বা রসিদপত্র খালিই থেকে যায়। সেখানে সেই
মহাজনের সই মেলে না।
আমি চলি
যে তার মন জোগাইয়া, দাখিলায় মেলে না সই।
মাঝে মাঝে রাতে
স্বপ্নে দেখি, ফেরেশতারা আমার এই দেহ-জমিন নীলামে তুলছে। আমার সব
অর্জন, সব পদবি, সব সম্পদ তাসের ঘরের
মতো ভেঙে পড়ছে। আমি চিৎকার করে বলতে চাই, “আমি তো তাঁরই
গোলাম ছিলাম!” কিন্তু তখন জবান বন্ধ হয়ে যায়। কেবল আমার আমলগুলো সাক্ষী দেয়—আমি কি
সত্যিই তাঁর মন জুগিয়ে চলেছিলাম, নাকি নিজের নফসের ইবাদত
করেছিলাম?
বিলীন
হওয়ার আকুতি (ফানা)
হে আল্লাহ! এই
মাটির ঘরটি আমার নয়, আমি জানি। এই রক্ত-মাংসের খাঁচাটি তোমারই
আমানত। আমার এই জমিদারি এক বিভ্রম। আমি তো কেবল এক মুসাফির, যে
বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। বৃষ্টি থামলেই আমাকে ফিরতে হবে
সেই আদি ঠিকানায়—যেখানে কোনো ‘আমি’ নেই, কেবল ‘তুমি’ আছো।
আহলে বায়তের সেই
মহান ত্যাগী আত্মাদের কথা মনে পড়ে। তাঁরা ঘর ছেড়েছিলেন ঘরের মালিককে পাওয়ার জন্য।
তাঁরা রক্ত দিয়েছিলেন মাটির পবিত্রতা রক্ষার জন্য। আর আমি? আমি এই নশ্বর মাটির মায়ায় মজে আসল মালিককে ভুলে বসে আছি।
সূর্য ডুবছে।
পশ্চিম আকাশে লাল আভা যেন শহীদি রক্তের এক নীরব স্মারক। আমি হাত তুলি। আমার চোখ
থেকে এক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ে মাটির ওপর। সেই অশ্রু যেখানে পড়ে, সেখানে যেন হঠাৎ করেই একগুচ্ছ শুভ্র রজনীগন্ধা ফুটে ওঠে। এটা কি মালিকের
ক্ষমা? নাকি এক নতুন আশার ইশারা?
‘আমি আর মালিক হতে চাই না। আমি শুধু তাঁর দরজার এক ধূলিকণা হতে চাই। কারণ, যে নিজেকে হারায় (ফানা), সেই তো তাকে পায়। এই মাটির ঘর ভেঙে চুরমার হয়ে যাক, তাতে দুঃখ নেই; যদি তার ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকে এক পলক সেই ‘জমিদারের’ দেখা মেলে।‘


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।